লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চৌপল্লী গ্রামের কাসারি বাড়িতে এখন শুধুই কান্না। একই পরিবারের সাতজন নারী-শিশুর নিথর দেহ পড়ে আছে পাশাপাশি, আর বিছানায় নিঃশব্দে অশ্রু ঝরাচ্ছেন বৃদ্ধ আবদুর রহিম। পাশে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন তাঁর ওমানফেরত ছেলে আবদুল বাহার। এই আবেগঘন দৃশ্য দেখতে আজ সকাল থেকে ভিড় করছেন শত শত মানুষ।
বাহারকে আনতেই পরিবারটি গিয়েছিল ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু ফেরার পথে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঘটে যায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। খালে পড়ে যায় তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাহারের মা, স্ত্রী, মেয়ে, শাশুড়ি ও আরও তিনজন ঘনিষ্ঠ স্বজন।
নিহতদের নাম:
ফয়জুন নেসা (৮০) – শাশুড়ি, খুরশিদা বেগম (৫৫) – স্ত্রী, কবিতা বেগম (৩০) – পুত্রবধূ, লাবনী বেগম (৩০) – পুত্রবধূ, রেশমি আক্তার (১০) – নাতনি, লামিয়া আক্তার (৯) – নাতনি, মীম আক্তার (২) – নাতনি
ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানালেন বাহার
তিন বছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন আবদুল বাহার। মা বলেছিলেন, “তোর জন্য কত অপেক্ষা করেছি, বাপ।” এই কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা।
বাহার বলেন, “গাড়িটা খালে পড়ে নৌকার মতো ভাসছিল। ড্রাইভারকে বারবার বলেছি দরজা খুলে দিতে, সে নিজে জানালা দিয়ে বের হয়ে গেল, কিন্তু দরজার লক খুলল না। আমরা কয়েকজন জানালা ভেঙে বের হলাম, বাকিরা ভেতরেই আটকা পড়ে মারা গেল।”
তিনি অভিযোগ করেন, চালক ঘুমিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। কুমিল্লায়ও একবার দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সাবধানতার কথা শোনেননি চালক।
ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের ভাষ্য
নোয়াখালীর ফায়ার সার্ভিসের চৌমুহনী স্টেশনের কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক জানান,
“মাইক্রোবাসে ১১ জন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর চালকসহ ৪ জন জানালা দিয়ে বের হন। পেছনের সারিতে থাকা ৭ জনই প্রাণ হারিয়েছেন।”
উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে সাতজনের মৃত্যুতে পুরো গ্রাম স্তব্ধ। আবদুর রহিমের পরিবারে যে শোক নেমেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
একটি পরিবারের শেষ দৃশ্য, চৌপল্লীর কাসারি বাড়িতে সাতটি ঘর। এখন প্রতিটি ঘরের আঙিনায় কেবল কান্না। আবদুর রহিম, যিনি জীবনভর পরিবার নিয়ে কাটিয়েছেন, এখন নিরব, নিঃশব্দ—শুধু চোখে অশ্রু। আর বাহার—ফিরলেন পরিবার হারিয়ে, বুক ফাঁটা কান্নায় বারবার বলছিলেন,
“সবারে একসঙ্গে বাঁচাইতে পারি নাই, এখন আমি কারে নিয়ে বাঁচব?”


