গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলীয় নুসাইরাত শরণার্থী ক্যাম্পে পানি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ৬ শিশু ও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৬ জন—এমনটাই জানিয়েছে গাজার জরুরি সেবা সংস্থাগুলো।
ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার ভোরে, যখন একদল মানুষ খালি জেরিকেন হাতে পানির ট্যাংকারের পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার ওপর আঘাত হানে।
ঢাকা সময় অনুযায়ী রবিবার বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতোই গাজার সিভিল ডিফেন্স ও হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করে, নিহতদের লাশ নুসাইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে আহত শিশু ও নারীসহ ১৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
‘কারিগরি ত্রুটি’র দাবি আইডিএফ-এর
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আইডিএফ (Israel Defense Forces) স্বীকার করেছে যে, ওই হামলায় “কারিগরি ত্রুটি” ঘটেছে। তারা জানিয়েছে, তাদের টার্গেট ছিল ইসলামিক জিহাদের একজন যোদ্ধা, কিন্তু “গোলাবারুদ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে কয়েক ডজন মিটার দূরে গিয়ে পড়ে”, যার ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, তারা “অসামরিক হতাহতের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ” করছে এবং “যথাসম্ভব অসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে কাজ করছে।” বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনার অধীন রয়েছে বলে জানায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
ভিডিও বিশ্লেষণে সত্যতা যাচাই
ঘটনার পরপরই ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে—জেরিকেন ও রক্তাক্ত শিশুদের ভিড়ে আতঙ্কিত লোকজন ছুটছে সাহায্যের জন্য।
BBC Verify ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে, এটি নুসাইরাত জুনিয়র হাই স্কুল থেকে প্রায় ৮০ মিটার দূরে একটি সড়কে ধারণ করা, যেখানে আশপাশে একটি কিন্ডারগার্টেনও রয়েছে।
তবে বিস্ফোরণটি কোন দিক থেকে এসেছে কিংবা সত্যিই এটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল কি না, ভিডিও থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একদিনেই নিহত ৫৩, আহত শতাধিক
এই হামলার আগেই গাজার অন্যান্য অংশেও দিনভর ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গুলিতে কমপক্ষে আরও ৪৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানায় গাজার সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি।
তাদের মধ্যে রাফাহে আইসিআরসি পরিচালিত হাসপাতালে একদিনে ভর্তি হন ১৩২ জন অস্ত্রজখম রোগী, যাদের মধ্যে ৩১ জন মারা যান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বেশিরভাগ রোগীর গুলিবিদ্ধ ক্ষত ছিল এবং সবাই খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন।
মানবিক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় বর্তমানে জীবনযাপন ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।
- ৯০% বাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত
- পানির ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত
- জ্বালানি, ওষুধ, খাবার ও আশ্রয়ের চরম সংকট
- গত ১৩০ দিনে প্রথমবারের মতো মাত্র ৭৫,০০০ লিটার জ্বালানি প্রবেশের অনুমতি মিলেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
জাতিসংঘের ৯টি সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, যদি এভাবে জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তাহলে হাসপাতাল, পানির পাম্পিং ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, এমনকি বেকারিগুলো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাবে।
সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘সহায়তা কেন্দ্রগুলো’
জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর জানায়, ২৭ মে থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েল সমর্থিত Gaza Humanitarian Foundation (GHF) পরিচালিত সহায়তা কেন্দ্রগুলোর আশপাশে ৬১৫টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
অতিরিক্ত ১৮৩টি মৃত্যু ঘটেছে UN ও অন্যান্য সহায়তা কাফেলার কাছে।
তবে GHF কর্তৃপক্ষ UN এর পরিসংখ্যানকে “ভুল ও বিভ্রান্তিকর” দাবি করে বলেছে, “GHF–এর কাছাকাছি মানেই GHF দায়ী নয়।”
প্রেক্ষাপট: অক্টোবর ৭ ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সূচনা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সীমান্ত হামলা দিয়ে, যেখানে ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হয়। এরপর ইসরায়েল গাজায় পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এ পর্যন্ত গাজায় ৫৭,৮৮২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
পানি, খাদ্য, ওষুধ—প্রতিটি মানবিক চাহিদা আজ গাজায় প্রাণঘাতী সংকটের নাম। এমন এক মুহূর্তে, যেখানে পানির লাইনে দাঁড়ানো শিশুরাও হামলার শিকার, সেখানে মানবাধিকার প্রশ্নে নীরবতা আর অবকাশ নেই।


