যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্ক এড়াতে বাংলাদেশকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (USTR)। শর্ত দুটি হলো—বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে হবে এবং দেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন শুল্ক হুমকি মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র তিনদিনব্যাপী দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনার প্রথম দিনেই উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বেশিরভাগ বিষয়ের ওপর ঐকমত্যে পৌঁছালেও, ৩৫ শতাংশ শুল্ক অব্যাহতি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত আসেনি। এই শুল্ক ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্কিন শর্ত ও বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক পারিশ্রমিক ও উৎপাদন ব্যয় অত্যধিক হওয়ায় টেক্সটাইল উৎপাদন সাশ্রয়ী নয়। এতে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে, যা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
তবে, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, এলএনজি, গম আমদানি এবং বোয়িং বিমান কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। এরই মধ্যে গম ও গ্যাস আমদানিতে বৃদ্ধি এবং বোয়িং বিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
শ্রম অধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বাংলাদেশ জানায়, নতুন শ্রম আইন পাশ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
বৈঠকের অংশগ্রহণকারী ও অগ্রগতি
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন নেতৃত্ব দেন। সঙ্গে ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী এবং ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। মার্কিন দিক থেকে কৃষি, জ্বালানি, বাণিজ্য, কপিরাইটসহ বিভিন্ন খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও জ্বালানি উপদেষ্টার পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৈঠক ছিল বিস্তৃত এবং ‘দুই দেশের মধ্যে প্রায় সব বাণিজ্যিক ইস্যু আলোচনায় এসেছে’।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “প্রথম দিনের আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে মার্কিন বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে আলোচনা হবে।”
খসড়া বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা
বৈঠকে একটি খসড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশকে শুল্ক অব্যাহতি প্রদান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই চুক্তি চূড়ান্ত হলে, বাংলাদেশকে নতুন করে ৩৫% বাড়তি শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের চিঠি ও অতিরিক্ত শর্ত
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ২০ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ২৫-৪০% শুল্ক আরোপের চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “যদি কেউ শুল্ক বাড়ায়, তা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের সঙ্গে যোগ করা হবে।”
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেওয়া চিঠিতে দুটি কঠিন শর্তের কথা বলা হয়:
১. যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বা বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, তা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে।
২. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে যে শুল্ক সুবিধা দেবে, তা অন্য কোনো দেশকে দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব শর্ত WTO (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা)-এর নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ WTO বলে—“ফেভার ওয়ান, ফেভার অল”, অর্থাৎ কাউকে দেওয়া সুবিধা অন্যদের কাছ থেকেও গোপন রাখা যাবে না।
বর্ধিত মার্কিন শুল্কের মুখে বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দাবি মানা, অন্যদিকে WTO নিয়ম ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা রক্ষা করা। আলোচনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের ফলাফলের দিকে এখন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক মহলের নজর।
👉 পরবর্তী বৈঠক: বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ও শুক্রবার দিনব্যাপী।


