“বিএনপি সংস্কারবিরোধী”—এই প্রচারকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, “সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু একটি চক্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে।”
রোববার (৬ জুলাই) বেলা ১১টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংস্কারে বিএনপির ইতিবাচক অবস্থান
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব বলেন, “বিএনপি সংস্কারের বিষয়ে আন্তরিক। এ কারণে ২০১৬ সালে ভিশন ২০৩০, ২০২০ সালে ২৭ দফা এবং ২০২২ সালে অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করে ৩১ দফা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে ছয়টি সংস্কার কমিশনে বিএনপি গঠনমূলক অংশগ্রহণ করেছে।”
তিনি জানান,
- জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০৮টি সুপারিশের মধ্যে ১৮৭টিতে বিএনপি একমত, ৫টিতে আংশিক একমত, ৫টিতে ভিন্নমত এবং ১১টিতে আপত্তি জানিয়েছে।
- দুদক সংস্কার কমিশনের ৪৭টির মধ্যে ৪৬টিতে একমত এবং ১টিতে (২৯ নম্বর প্রস্তাব) শর্তসাপেক্ষ আপত্তি।
- বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের ৮৯টি সুপারিশের মধ্যে ৬২টিতে পূর্ণ সমর্থন, ৯টিতে আংশিক এবং ১৮টিতে ভিন্নমত।
- নির্বাচনী ব্যবস্থাবিষয়ক সংস্কার কমিশনের ২৪৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৪১টিতে একমত, ১৪টিতে আংশিক এবং ৬৪টিতে ভিন্নমতসহ একমত।
- সংবিধান সংস্কার কমিশনের ১৩১টি সুপারিশে বিএনপি অধিকাংশে একমত, উল্লেখযোগ্যভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণে ছাড় দিয়েছে।
গুজব ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সতর্কতা
মির্জা ফখরুল বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিডিয়ার কিছু অংশ এবং কিছু ব্যক্তিত্ব বিএনপির সংস্কারপন্থী অবস্থানকে আড়াল করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “সংস্কারে অংশগ্রহণ মানে এই নয় যে আমরা সবকিছু গিলে খাব। গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর যৌক্তিক পর্যালোচনা ও বিতর্কই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রসঙ্গে সতর্ক আশাবাদ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, “এতে যেমন আমাদের অনেক আশা ও আগ্রহ রয়েছে, তেমনি হতাশা ও উৎকণ্ঠাও রয়েছে। একদিকে কমিশনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে আমরা সহযোগিতা করছি, অন্যদিকে কিছু বিষয়ে অযৌক্তিক ও নতুন নতুন প্রস্তাব দিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “যেসব প্রস্তাব সংসদ ও সরকারকে অকার্যকর করার দিকে যায়, সেগুলোর যৌক্তিক বিরোধিতা আমরা করেছি। এটি সংস্কারপ্রক্রিয়ায় বাধা নয়, বরং সহায়ক ভূমিকা।”
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের পথেই বিএনপি
নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, “সে বিষয়ে আমি এখনই কিছু বলব না। তবে যারা নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায়, তারা গণতন্ত্রের শক্তি নয়।”
তিনি বলেন, “বিএনপি বিপ্লবের মাধ্যমে নয়, নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়। ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার—এই তিনটি আমাদের সংগ্রামের মূল মন্ত্র।”
বিবেচনার বিষয়: রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের
মির্জা ফখরুল বলেন, “রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণের মতামত ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন করা যায় না। তাই যেকোনো সংস্কার বা পরিবর্তনে জনমত ও গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট থাকতে হবে।”
র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে ঐকমত্য?
পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিষয়ে এখনো পূর্ণ আলোচনা হয়নি জানালেও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সেখানে র্যাব বিলুপ্তিসহ বেশিরভাগ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি তাদের সংস্কারবান্ধব অবস্থানকে তুলে ধরতে চেয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার প্রচারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। এটি বিএনপির রাজনীতির গতিপথ ও সংস্কারপ্রক্রিয়ায় দলটির অবস্থান স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করে।


